সরকার কার্যত আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে মন্তব্য করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন সংস্কারের নামে যত উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা লোক দেখানো। প্রায় সব ক্ষেত্রেই সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে ‘অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশ্য প্রণয়নে সংস্কার বিমুখতা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশ, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ এবং জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশের বিষয়ে টিআইবির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।

টিআইবির সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ সরকার একতরফাভাবে অংশীজনদের সম্পৃক্ত না করে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খসড়া অধ্যাদেশ স্বল্প সময়ের জন্য লোক দেখানোভাবে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে দায় এড়ানো হয়েছে। অবহেলিত হয়েছে। এমনকি কোনো কোনো অংশীজনদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার হয়েছে। সরকার আইন প্রণয়ন ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রত্যাশিত স্বচ্ছতা ও স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের চর্চার উদহারণ সৃষ্টি করতে পারেনি।
আমলাতন্ত্রের কাছে সরকারের নতিস্বীকারের উদাহরণ দিয়ে পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ ও এনজিও খাতে বিদেশি অনুদান সংক্রান্ত অধ্যাদেশের মতো ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সফল ক্ষেত্রে সংস্কার বিরোধী মহল, বিশেষ করে আমলাতন্ত্রের প্রভাবশালী মহলের অন্তর্ঘাতমূলক অপশক্তির কাছে সরকারের নতি স্বীকারের ফলে সংস্কার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, সাইবার সুরক্ষা, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা, জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশে প্রতিটি জাতীয় স্বার্থের তুলনায় আমলাতন্ত্রসহ ক্ষমতাসীনদের একচ্ছত্র ও জবাবদিহিহীন কর্তৃত্বের চর্চা অব্যাহত রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে।
অধ্যাদেশ যেভাবে প্রণীত হয়েছে, তাতে এর স্বাধীন পুলিশ কমিশনের স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ করা হয়েছে। লোক-দেখানো এ অধ্যাদেশে এমন অনেক উপদান রয়েছে যাতে তথাকথিত পুলিশ কমিশন অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসনিক ও পুলিশ আমলাদের ক্ষমতার অব্যাহত অপব্যবহারের রিসোর্ট ছাড়াকিছুই হবে না। বাস্তবে এটি পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহারের সুরক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।
টিআইবি বলছে,সাইবার সুরক্ষা, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা ও জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশে যুগোপযোগী ইতিবাচক বিধান রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে টিআইবি। এতে বলা হয়েছে, তারপরও কর্তৃত্ববাদী আমলের মতো ব্যাপক নজরদারিভিত্তিক শাসনব্যবস্থা চলমান রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে।
দুদক সংস্কার কমিশনের আশু করণীয় সুপারিশ গুরত্ব পায়নি অভিযোগ করে টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘অন্য কোনো অংশীজনকে সম্পৃক্ত না করে দুদক ও সরকারি আমলাতন্ত্রের একচ্ছত্র কর্তৃত্বে দুদকের পরিপূর্ণ স্বাধীনতার পাশাপাশি জবাবদিহিতা নিশ্চিতের সুপারিশ উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাদ দেয়া হয়েছে। সংস্কার প্রতিবেদনে দুদকের শীর্ষ কর্তৃপক্ষের যেমন দ্বিমত ছিল না, তেমনি জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর নোট অব ডিসেন্ট ছিল না দুদক সংস্কারে।
গেল দেড় বছরের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, উপদেষ্টা পরিষদ বা মন্ত্রিপরিষদ নামে কর্তৃপক্ষ থাকলেও বাস্তবে অপারেশনাল সিদ্ধান্ত সেখানে নেয়া হয় না। কোন কাগজে সই হবে, কোন সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে, কোন ধারা বা তারিখ থাকবে কিংবা বাদ যাবে, এসব বিষয় উপদেষ্টা পরিষদ চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে না। এসব সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে থাকা অত্যন্ত ক্ষমতাবান কিছু ব্যক্তি বা মহলের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। এই মহলগুলো শুধু নিজেদের গোষ্ঠীস্বার্থই নয়, বরং রাজনৈতিক স্বার্থ এবং কখনও কখনও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের একাংশের স্বার্থও সুরক্ষিত রাখে।
টিআইবি নির্বাহী পরিচালক অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত শক্তিগুলোই নীতিগত নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির বিরোধিতা করে এবং সংস্কারকে বাধাগ্রস্ত করে। উপদেষ্টা বা মন্ত্রীর তুলনায় প্রশাসনের একটি অংশ পর্দার আড়াল থেকে বেশি প্রভাব বিস্তার করে।
আশিক/মি.
শর্ত সমূহ:
অশালিন শব্দ/বাক্য ব্যবহার করা যাবে না। কাউকে কটাক্ষ করা যাবে না। কারো প্রতি আক্রমনাত্বক বক্তব্য পেশ করা যাবে না।