ইন্টারনেটের এমন এক অংশ রয়েছে, যেখানে সাধারণ সার্চ ইঞ্জিন দিয়ে সহজে প্রবেশ করা যায় না। পরিচয় গোপন রেখে যোগাযোগ, চুরি হওয়া তথ্য কেনাবেচা, মাদক ও অবৈধ পণ্যের ব্যবসাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে এই অংশ পরিচিত ‘ডার্ক ওয়েব’ নামে। তবে ডার্ক ওয়েবের সব ব্যবহারই অবৈধ নয়; সাংবাদিকতা, গোপন যোগাযোগ ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার কাজেও এটি ব্যবহৃত হয়।
সম্প্রতি ভারতের স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (এসবিআই) প্রায় ৩ হাজার ৮৯৭ গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য ডার্ক ওয়েবে পাওয়া যাওয়ার খবর নতুন করে আলোচনায় এনেছে ইন্টারনেটের এই গোপন অংশকে। ফাঁস হওয়া তথ্যের মধ্যে নাম, মোবাইল নম্বর, জন্মতারিখ, ই-মেইল, বাসার ঠিকানা ও ঋণসংক্রান্ত বিবরণ রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
ডার্ক ওয়েব কী?
ইন্টারনেটকে সাধারণভাবে তিনটি ভাগে ব্যাখ্যা করা হয়—সারফেস ওয়েব, ডিপ ওয়েব ও ডার্ক ওয়েব।
সারফেস ওয়েব: ইন্টারনেটের যে অংশ গুগল, বিংয়ের মতো সার্চ ইঞ্জিনে খুঁজে পাওয়া যায়, সেটিই সারফেস ওয়েব। সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট, অনলাইন শপ ও উন্মুক্ত ব্লগ এর উদাহরণ।
ডিপ ওয়েব: ইন্টারনেটের যে অংশ সার্চ ইঞ্জিনে সাধারণভাবে তালিকাভুক্ত থাকে না এবং প্রবেশের জন্য লগইন বা বিশেষ অনুমতি প্রয়োজন হয়, তা ডিপ ওয়েবের অন্তর্ভুক্ত। ব্যক্তিগত ই-মেইল, অনলাইন ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট, হাসপাতালের রোগীর রেকর্ড ও প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ তথ্য এর উদাহরণ। ডিপ ওয়েবের বড় অংশই বৈধ ও দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত হয়।
ডার্ক ওয়েব: ডার্ক ওয়েব হলো ডিপ ওয়েবের একটি ছোট অংশ, যেখানে প্রবেশের জন্য বিশেষ সফটওয়্যার বা নেটওয়ার্ক প্রয়োজন হতে পারে। টর (Tor) নেটওয়ার্ক এর পরিচিত একটি মাধ্যম। এখানে ওয়েবসাইট ও ব্যবহারকারীর পরিচয় আড়াল রাখা তুলনামূলক সহজ হতে পারে। তবে পরিচয় গোপন থাকার অর্থ সম্পূর্ণ নিরাপদ বা শনাক্ত করা অসম্ভব—এমন নয়।
ডার্ক ওয়েবে কী কী হয়?
ডার্ক ওয়েবের বৈধ ও অবৈধ—দুই ধরনের ব্যবহার রয়েছে। তবে চুরি হওয়া তথ্য এবং সাইবার অপরাধের বিভিন্ন সেবা কেনাবেচার কারণে এটি বিশেষভাবে আলোচিত।
১. চুরি হওয়া ব্যক্তিগত তথ্য কেনাবেচা
হ্যাকাররা কোনো ব্যাংক, প্রতিষ্ঠান বা অনলাইন সেবা থেকে তথ্য চুরি করলে তা ডার্ক ওয়েবের বিভিন্ন ফোরামে প্রকাশ বা বিক্রির চেষ্টা করতে পারে। এসব তথ্যে নাম, ফোন নম্বর, ঠিকানা, ই-মেইল, পাসওয়ার্ড ও আর্থিক বিবরণ থাকতে পারে। তথ্যের ধরন ও মান অনুযায়ী অপরাধীরা এগুলো ব্যবহার করে প্রতারণা বা পরিচয় জালিয়াতির চেষ্টা করতে পারে।
২. হ্যাকিংয়ের সরঞ্জাম ও সেবা
কিছু অবৈধ মার্কেটপ্লেসে চুরি করা অ্যাকাউন্ট, ক্ষতিকর সফটওয়্যার, ফিশিংয়ের সরঞ্জাম এবং সাইবার হামলার সেবা পাওয়া যায়। এসবের মাধ্যমে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট দখল, প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ কিংবা তথ্য হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়।
৩. মাদক ও অবৈধ পণ্যের ব্যবসা
ডার্ক ওয়েবের কিছু মার্কেটপ্লেসে মাদক, জাল নথি, চোরাই পণ্য ও অন্যান্য নিষিদ্ধ সামগ্রীর কেনাবেচা হয়। এসব লেনদেনের সঙ্গে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রও যুক্ত থাকতে পারে। তবে ডার্ক ওয়েবের সব ওয়েবসাইট বা লেনদেন এমন নয়।
৪. মুক্ত গণমাধ্যম ও গোপন যোগাযোগ
কিছু সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, গবেষক এবং নির্যাতন বা নজরদারির ঝুঁকিতে থাকা মানুষ পরিচয় গোপন রেখে যোগাযোগের জন্য ডার্ক ওয়েবভিত্তিক সেবা ব্যবহার করেন। কিছু সংবাদমাধ্যম ও তথ্যদাতা নিরাপদে নথি আদান-প্রদানের ব্যবস্থাও রাখে। এ ধরনের ব্যবহার বৈধ উদ্দেশ্যে হতে পারে।
৫. তথ্য ফাঁস ও সাইবার হামলার দাবি প্রকাশ
কোনো প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে হামলার পর অপরাধীরা চুরি করা তথ্য প্রকাশের হুমকি দিতে পারে। কখনো নমুনা তথ্য প্রকাশ করে অর্থ দাবি করা হয়, আবার কখনো পুরো তথ্যভান্ডার বিক্রির বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। তবে ডার্ক ওয়েবে কোনো তথ্যের উপস্থিতি দেখেই সেটি সত্য, সম্পূর্ণ বা নতুন করে চুরি করা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
ডার্ক ওয়েবে তথ্য গেলে কী ঝুঁকি তৈরি হয়?
ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হলে তা দিয়ে প্রতারকেরা ভুয়া পরিচয়ে যোগাযোগ, লক্ষ্যভিত্তিক ফিশিং, অ্যাকাউন্টে অনুপ্রবেশ ও আর্থিক প্রতারণার চেষ্টা করতে পারে। ব্যাংকিং তথ্য বা পরিচয়সংক্রান্ত নথি ফাঁস হলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো গ্রাহকের নাম, ফোন নম্বর ও ব্যাংক-সম্পর্কিত তথ্য একসঙ্গে ফাঁস হলে প্রতারক ব্যাংকের কর্মকর্তা পরিচয়ে ফোন করে ওটিপি বা পাসওয়ার্ড চাইতে পারে। তথ্যগুলো ব্যবহার করে বিশ্বাসযোগ্য ভুয়া বার্তা বা ই-মেইলও তৈরি করা সম্ভব। তবে শুধু নাম বা ফোন নম্বর ফাঁস হলেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ তুলে নেয়া সম্ভব—বিষয়টি এমন নয়।
ডার্ক ওয়েব কি পুরোপুরি নিরাপদ ও গোপন?
না। বিশেষ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলেও ব্যবহারকারীর পরিচয় শতভাগ গোপন থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ভুল কনফিগারেশন, ক্ষতিকর ফাইল, প্রতারণামূলক ওয়েবসাইট কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে ব্যবহারকারী শনাক্ত হতে পারেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও বিভিন্ন প্রযুক্তি ও তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত করতে পারে।
এ ছাড়া, ডার্ক ওয়েবের কিছু সাইটে প্রতারণা, ম্যালওয়্যার ও অবৈধ কনটেন্টের ঝুঁকি রয়েছে। তাই শুধু কৌতূহল থেকে অপরিচিত লিংকে প্রবেশ, ফাইল ডাউনলোড বা ব্যক্তিগত তথ্য দেয়াও বিপজ্জনক হতে পারে।
ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় করণীয়
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সাধারণ পরামর্শ অনুযায়ী, অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি—
- প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে আলাদা ও শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা।
- সম্ভব হলে দুই ধাপের যাচাইকরণ (টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন) চালু রাখা।
- ফোন, ই-মেইল বা বার্তায় কেউ ওটিপি, পিন কিংবা পাসওয়ার্ড চাইলে তা না দেয়া।
- সন্দেহজনক লিংক ও অপরিচিত ফাইল এড়িয়ে চলা।
- ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেন দেখা গেলে দ্রুত ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করা।
- তথ্য ফাঁসের খবর পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়া।
সব মিলিয়ে, ডার্ক ওয়েব নিজে কোনো একক অপরাধের জায়গা নয়; এটি ইন্টারনেটের এমন একটি অংশ, যেখানে গোপনীয়তা রক্ষার বৈধ ব্যবহার যেমন রয়েছে, তেমনি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও ঘটে। ব্যক্তিগত তথ্য চুরি ও তার অপব্যবহারের ঝুঁকি থাকায় অনলাইনে সতর্কতা, শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং দ্রুত তথ্য ফাঁস শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।
শর্ত সমূহ:
অশালিন শব্দ/বাক্য ব্যবহার করা যাবে না। কাউকে কটাক্ষ করা যাবে না। কারো প্রতি আক্রমনাত্বক বক্তব্য পেশ করা যাবে না।