মানুষের জীবনে এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যা চোখে দেখা যায় না; কিন্তু তার প্রভাব মানুষের জীবনে অনুভূত হতে পারে। বদনজর বা কুদৃষ্টি তেমনই একটি বিষয়। আধুনিক সময়ে এ বিষয়ে সমাজে যেমন নানা ধরনের ভুল ধারণা রয়েছে, তেমনি কেউ কেউ এটিকে নিছক কুসংস্কার বলেও উড়িয়ে দেন। আবার অনেকে জীবনের প্রায় প্রতিটি বিপদ-আপদের পেছনে বদনজরকে দায়ী করেন। ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এ দুই চরম অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ ভারসাম্যপূর্ণ।
বদনজর বাস্তব—কিন্তু প্রতিটি বিপদকে বদনজরের ফল মনে করা সঠিক নয়। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো শরিয়তের নির্দেশনা অনুসরণ করা, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং কুসংস্কার থেকে নিজেকে দূরে রাখা।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«الْعَيْنُ حَقٌّ»
অর্থ: “বদনজর সত্য।”
—সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৮৭।
এ হাদিস অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হলেও এর তাৎপর্য গভীর। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ইসলামে বদনজরের অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়নি। একই সঙ্গে বদনজরকে এমন কোনো স্বাধীন শক্তি হিসেবেও বিশ্বাস করা যাবে না, যা আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কিছু করতে পারে।
মুমিনের আকিদা হলো—জগতের সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছা ও ক্ষমতার অধীন। তাই কোনো অনিষ্ট দেখা দিলে আল্লাহর কাছেই আশ্রয় চাইতে হবে।
হিংসা ও কুদৃষ্টির ভয়াবহতা-
মানুষের অন্তরের অন্যতম ভয়ংকর ব্যাধি হলো হিংসা। অন্যের সুখ, সৌন্দর্য, সম্পদ, সন্তান, জ্ঞান কিংবা সাফল্য দেখে অন্তরে অস্বস্তি সৃষ্টি হওয়া এবং তার নিয়ামত দূর হয়ে যাক—এমন আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা হিংসার লক্ষণ।
আল্লাহ তাআলা সূরা আল-ফালাকে বলেন—
وَمِن شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ
অর্থ: “এবং হিংসুক যখন হিংসা করে, তখন তার অনিষ্ট থেকে।”
খেয়াল করলে দেখা যায়, আল্লাহ তাআলা আমাদের এমন একজন হিংসুকের অনিষ্ট থেকেও আশ্রয় চাইতে শিক্ষা দিয়েছেন, যে হিংসা প্রকাশ করে বা তার হিংসার কারণে ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠে।
তাই বদনজরের আলোচনা শুধু চোখের দৃষ্টির আলোচনা নয়; এর সঙ্গে মানুষের অন্তর, হিংসা, ঈর্ষা ও নৈতিকতারও গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
প্রশংসা এবং বরকতের দোয়া-
আমরা প্রায়ই কারও সন্তান, সৌন্দর্য, পোশাক, বাড়ি, গাড়ি, ব্যবসা কিংবা কোনো সাফল্য দেখে মুগ্ধ হই। প্রশংসা করা নিজে দোষের বিষয় নয়। তবে একজন মুসলমানের উচিত অন্যের কোনো নিয়ামত দেখে আল্লাহর নাম স্মরণ করা এবং তার জন্য বরকতের দোয়া করা।
যেমন বলা যায়—
مَا شَاءَ اللهُ، بَارَكَ اللهُ
অর্থ: “আল্লাহ যা চেয়েছেন তাই হয়েছে; আল্লাহ বরকত দান করুন।”
এতে মানুষের প্রতি শুভকামনাও প্রকাশ পায় এবং নিজের অন্তরও হিংসা ও ঈর্ষা থেকে রক্ষা পায়।
বদনজর থেকে রক্ষার উপায় কী?
ইসলাম মানুষকে বদনজরের ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে থাকতে বলেনি। বরং আল্লাহর ওপর নির্ভর করতে এবং তাঁর কাছে আশ্রয় চাইতে শিক্ষা দিয়েছে।
নিয়মিত নামাজ আদায়, কুরআন তিলাওয়াত, সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন জিকির এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করা মুমিনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ আমল।
বিশেষভাবে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করা উচিত। সূরা ফালাকের শেষ আয়াতেই হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়ার শিক্ষা রয়েছে।
বদনজরের ক্ষেত্রে শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ বা দোয়া-ভিত্তিক চিকিৎসারও অনুমোদন রয়েছে। সহিহ মুসলিমে আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বদনজরের জন্য রুকইয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন।
সন্তানদের ক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্ব-
সন্তান আল্লাহ তাআলার বিশেষ নিয়ামত। তাই সন্তানকে নিয়ে অহেতুক প্রদর্শন, অতিরিক্ত প্রচার কিংবা অন্যের সামনে নিজের গর্ব প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকা ভালো। সন্তানকে নিয়ে সবসময় ভয় পাওয়ারও প্রয়োজন নেই; বরং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে তার জন্য দোয়া করতে হবে।
কোনো শিশু অসুস্থ হলে শুধু বদনজর হয়েছে মনে করে চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়। বরং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে। কারণ দোয়া ও চিকিৎসা—দুটিই গ্রহণ করা একজন দায়িত্বশীল মুসলমানের জন্য স্বাভাবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পথ।
বদনজরের নামে কুসংস্কার নয়-
বদনজর সত্য—এ কথা যেমন ইসলামী দলিল দ্বারা প্রমাণিত, তেমনি বদনজরকে কেন্দ্র করে সমাজে প্রচলিত সব ধারণা ইসলামসম্মত—এ কথাও সত্য নয়।
কেউ অসুস্থ হলেই নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে দায়ী করা, কারও প্রতি সন্দেহ সৃষ্টি করা কিংবা নানা অজ্ঞতাপূর্ণ পদ্ধতির মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খোঁজা উচিত নয়। এতে পরিবার ও সমাজে অকারণ সন্দেহ, শত্রুতা এবং সম্পর্কের অবনতি সৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষ করে শিশু অসুস্থ হলেই ‘অমুকের নজর লেগেছে’ বলে কাউকে দোষারোপ করা অত্যন্ত অনুচিত। কারণ প্রকৃত কারণ না জেনে এমন অভিযোগ মানুষের মনে বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে বদনজর-
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনকে অনেকটাই প্রকাশ্য করে দিয়েছে। মানুষের ব্যক্তিগত আনন্দ, পারিবারিক অনুষ্ঠান, সন্তান, সম্পদ, ভ্রমণ, ব্যবসা ও বিভিন্ন অর্জনের ছবি মুহূর্তেই বহু মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
এখানে একটি ভারসাম্য প্রয়োজন। ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি বিষয় সবার সামনে প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই। নিজের নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা এবং অহেতুক প্রদর্শন থেকে বিরত থাকা একজন সচেতন মুসলমানের সৌন্দর্য।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ছবি প্রকাশ করলেই বদনজর লাগবেই—এমন ধারণাও সঠিক নয়। ভয় ও সন্দেহের পরিবর্তে সচেতনতা, সংযম এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলই হওয়া উচিত আমাদের পথ।
অন্যের নিয়ামত দেখে হিংসা নয়-
আমাদের সমাজে অনেক সময় অন্যের উন্নতি দেখে আমরা অস্বস্তি বোধ করি। কেউ ভালো চাকরি পেয়েছে, কেউ ব্যবসায় সফল হয়েছে, কারও সন্তান ভালো ফল করেছে, কেউ সম্মান পেয়েছে—এসব দেখে তার জন্য আনন্দিত হওয়ার পরিবর্তে যদি আমাদের অন্তরে হিংসা জন্ম নেয়, তাহলে ক্ষতি প্রথমে আমাদের নিজেদেরই।
একজন মুমিনের মানসিকতা হওয়া উচিত—
“আল্লাহ তাকে বরকত দিন, আর আমাকেও তাঁর অনুগ্রহ থেকে দান করুন।”
অন্যের নিয়ামত দেখে নিজের জন্য আল্লাহর কাছে চাওয়া হিংসা নয়; বরং আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতি আশাবাদী হওয়া।
বদনজর থেকে বড় শিক্ষা-
বদনজরের বিষয়টি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—মানুষের বাহ্যিক আচরণের পাশাপাশি তার অন্তরেরও সংশোধন প্রয়োজন।
আমরা যেন অন্যের সৌন্দর্য দেখে হিংসা না করি, অন্যের সাফল্যে কষ্ট না পাই, অন্যের সন্তান দেখে ঈর্ষান্বিত না হই এবং অন্যের নিয়ামত দেখে তা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা না করি।
বরং আমরা যেন পরস্পরের জন্য কল্যাণ কামনা করি, আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করি এবং একে অপরের জন্য বরকতের দোয়া করি।
বদনজর ইসলামী শরিয়তে স্বীকৃত একটি বাস্তব বিষয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ এর বাস্তবতা ঘোষণা করেছেন এবং এর প্রতিকারে রুকইয়ার অনুমোদনও দিয়েছেন।
তবে বদনজর নিয়ে ভয়, সন্দেহ ও কুসংস্কার ছড়িয়ে দেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। আমাদের করণীয় হলো—আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা, নিয়মিত ইবাদত ও মাসনূন জিকির করা, কুরআনের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া এবং অন্যের নিয়ামত দেখে তার জন্য কল্যাণ ও বরকতের দোয়া করা।
মনে রাখতে হবে, কোনো দৃষ্টি, কোনো মানুষ কিংবা কোনো অদৃশ্য কারণ স্বাধীনভাবে ক্ষতি করতে পারে না; সবকিছুই মহান আল্লাহর ইচ্ছা ও ক্ষমতার অধীন।
তাই বদনজর নিয়ে আতঙ্ক নয়—প্রয়োজন সচেতনতা।
হিংসা নয়—প্রয়োজন ভালোবাসা।
কুসংস্কার নয়—প্রয়োজন শরিয়তের শিক্ষা।
আর মানুষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নয়—প্রয়োজন মহান আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল।
আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরকে হিংসা-বিদ্বেষ থেকে পবিত্র করুন, আমাদের ও আমাদের পরিবারকে সব ধরনের অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন এবং অন্যের নিয়ামত দেখে তার জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: মাওঃ সাইফুল্লাহ বিন নাসির।
প্রভাষক (আরবি), উত্তর মুরাদিয়া বশিরিয়া দারুচ্ছুন্নাত ফাজিল মাদ্রাসা, দুমকী, পটুয়াখালী।
শর্ত সমূহ:
অশালিন শব্দ/বাক্য ব্যবহার করা যাবে না। কাউকে কটাক্ষ করা যাবে না। কারো প্রতি আক্রমনাত্বক বক্তব্য পেশ করা যাবে না।