মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন এক কৌশলগত অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি ঘিরে পশ্চিম এশিয়া থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত বদলে যেতে পারে নিরাপত্তা ও শক্তির সমীকরণ।
গেল ৭ আগস্ট মক্কায় স্বাক্ষরিত ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’-এর আওতায় তিন দেশ পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে। চুক্তির মূল নীতিগুলোর একটি হলো, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। পাকিস্তান ও তুরস্ক অবশ্য স্পষ্ট করেছে, এই চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে করা হয়নি এবং এটি মূলত প্রতিরক্ষামূলক।
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের কাছে এর গুরুত্ব শুধু চুক্তির ঘোষণায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রশ্ন উঠছে, কেন এই সময়ে সৌদি আরব এমন একটি নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে এগোল এবং এর সঙ্গে তুরস্ক ও পাকিস্তানকে কেন যুক্ত করা হলো?
এর পেছনে অন্যতম বড় কারণ মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি। সাম্প্রতিক সংঘাত ও হামলার পর উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে নিজেদের নিরাপত্তা সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবনা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে বিকল্প নিরাপত্তা অংশীদারিত্বও গড়ে তুলতে চাইছে। বিশ্লেষকদের মতে, রিয়াদের কৌশল এখন একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভর না করে একাধিক অংশীদারের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক তৈরি করা।
এই সমীকরণে পাকিস্তানের গুরুত্ব আলাদা। দেশটির রয়েছে বড় ও অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী এবং পারমাণবিক সক্ষমতা। সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সম্পর্কও নতুন নয়। ২০২৫ সালে দুই দেশ একটি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছিল। ফলে নতুন ত্রিপক্ষীয় কাঠামোকে আগের সম্পর্কেরই আরও বিস্তৃত রূপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে তুরস্ক নিয়ে আসছে উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, ড্রোন সক্ষমতা এবং ন্যাটো সদস্য হিসেবে বড় সামরিক অভিজ্ঞতা। ফলে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি, পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা এবং তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি—এই তিনটি উপাদান একসঙ্গে নতুন ধরনের আঞ্চলিক শক্তি তৈরি করতে পারে।
এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে ইরান, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের ওপর। যদিও চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দেশকে লক্ষ্য করছে না, তবু ইরানের সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তেহরান বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের জন্যও নতুন সমীকরণটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের জন্যও এই জোটের তাৎপর্য রয়েছে। পাকিস্তান যদি সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি এবং তুরস্কের সামরিক-প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে নয়াদিল্লি এই নতুন সমীকরণকে সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
তবে এটিকে এখনই ‘মুসলিম ন্যাটো’ হিসেবে চিহ্নিত করা অতিরঞ্জিত হতে পারে। চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ, যৌথ কমান্ড কাঠামো, সেনা মোতায়েন, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সংকটের সময় তিন দেশের সামরিক প্রতিক্রিয়া—এসব বিষয়ে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার নয়। বিশ্লেষকদের মতে, এর তাৎক্ষণিক গুরুত্ব সামরিক অভিযানের চেয়ে কৌশলগত বার্তা ও প্রতিরোধ সক্ষমতা তৈরিতে বেশি হতে পারে।
সব মিলিয়ে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি শুধু তিন দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সম্প্রসারণ নয়। এটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের পুরোনো নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য নতুন অংশীদার খুঁজছে।
এখন দেখার বিষয়, মক্কার এই চুক্তি কি কেবল কৌশলগত বার্তা হিসেবেই থাকবে, নাকি ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়াকে যুক্ত করা একটি কার্যকর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় পরিণত হবে। সেই উত্তরই নির্ধারণ করতে পারে আগামী দিনের পশ্চিম এশিয়ার শক্তির মানচিত্র।
আশিক/মি.
শর্ত সমূহ:
অশালিন শব্দ/বাক্য ব্যবহার করা যাবে না। কাউকে কটাক্ষ করা যাবে না। কারো প্রতি আক্রমনাত্বক বক্তব্য পেশ করা যাবে না।