বিশেষায়িত অ্যাটাক হেলিকপ্টার, বহুমুখী সামরিক পরিবহন এবং সাবমেরিনবিরোধী অভিযানের উপযোগী নৌ-হেলিকপ্টার তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করছে চীন। দেশটির পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) হেলিকপ্টার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্পে স্বনির্ভরতা অর্জনের প্রচেষ্টাও জোরদার হয়েছে। সামরিক প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামার অংশ হিসেবে এই অগ্রগতি বেইজিংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সামরিক বিষয়ক সাময়িকী মিলিটারি ওয়াচ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের সামরিক হেলিকপ্টার কর্মসূচি অন্যান্য প্রতিরক্ষা প্রকল্পের তুলনায় কম আলোচিত হলেও এর মাধ্যমে জটিল সামরিক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশ ঘটানো হচ্ছে।
চীনের আক্রমণকারী হেলিকপ্টার বহরের অন্যতম প্রধান শক্তি জেড-১০। ২০০৩ সালে প্রথম উড্ডয়নের পর ২০১০ সালে এটি সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হয়। দুই আসনবিশিষ্ট এই হেলিকপ্টার থেকে ট্যাংকবিধ্বংসী গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং রকেট ছোড়া যায়। এতে রয়েছে উন্নত লক্ষ্য নির্ধারণ ব্যবস্থা ও প্রতিরক্ষামূলক প্রযুক্তি।
পরবর্তী সংস্করণগুলোতে যুক্ত হয়েছে উন্নত বর্ম, সতর্কতামূলক সেন্সর এবং দীর্ঘপাল্লার গাইডেড অস্ত্র। রপ্তানির জন্য তৈরি জেড-১০এমই সংস্করণে মূল রোটরের ওপরে মিলিমিটার-ওয়েভ রাডার যুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া অনুসন্ধান ও আক্রমণ—দুই ধরনের অভিযানে ব্যবহারের উপযোগী জেড-১৯ হেলিকপ্টারও রয়েছে চীনের বহরে।
২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আসা জেড-২১ চীনের নতুন প্রজন্মের ভারী অ্যাটাক হেলিকপ্টার হিসেবে আলোচনায় এসেছে। জেড-১০-এর তুলনায় এতে উন্নত সুরক্ষা, বিস্তৃত সেন্সর ব্যবস্থা এবং বেশি অস্ত্র বহনের সক্ষমতা রয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রাশিয়ার এমআই-২৮ ও কেএ-৫২ এবং যুক্তরাষ্ট্রের এএইচ-৬৪-এর মতো হেলিকপ্টারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এটি উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা দেখাতে পারে।
চীনের সামরিক হেলিকপ্টার আধুনিকায়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প জেড-২০ সিরিজ। ২০১৩ সালে প্রথম উড্ডয়নের পর ২০১৯ সালে এটি সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। দুটি ডব্লিউজেড-১০ টার্বোশ্যাফট ইঞ্জিনচালিত এই হেলিকপ্টার পূর্ণ সরঞ্জামসহ সর্বোচ্চ ১৩ জন সদস্য পরিবহন করতে পারে।
জেড-২০ পরিবারের বিভিন্ন সংস্করণ পরিবহন, আক্রমণ ও নৌ-অভিযানের জন্য তৈরি করা হয়েছে। জেড-২০টি সশস্ত্র অভিযানে ব্যবহারের উপযোগী। এতে গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট বহনের ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যদিকে নৌবাহিনীর জন্য তৈরি জেড-২০এফ সাবমেরিনবিরোধী অভিযানে ব্যবহার করা যায়। এতে পানির নিচে নামানো যায় এমন সোনার, সোনোবুই মোতায়েনের সরঞ্জাম এবং হালকা টর্পেডো বহনের সক্ষমতা রয়েছে।
জাহাজ থেকে পরিচালিত পরিবহন ও আক্রমণ অভিযানের জন্য তৈরি করা হয়েছে জেড-২০জে সংস্করণ। এসব প্রযুক্তির ফলে চীনের যুদ্ধজাহাজ ও উভচর অভিযানে ব্যবহৃত জাহাজগুলোর সামরিক সক্ষমতা আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া পুরোনো জেড-৮ হেলিকপ্টারকে পরিবহন, অনুসন্ধান ও উদ্ধার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং আকাশপথে কমান্ড পরিচালনার উপযোগী করে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ায় তৈরি এমআই-১৭ ও এমআই-১৭১ হেলিকপ্টার এখনো চীনের সামরিক পরিবহন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
চীনের নৌবাহিনীতে রুশ নির্মিত কেএ-২৮ সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধ এবং কেএ-৩১ আকাশপথে রাডার পরিচালনার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে জেড-২০-এর নৌ-সংস্করণগুলোর উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এসব বিদেশি হেলিকপ্টারের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে রাশিয়ার এমআই-২৬-এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম আরও বেশি ভার বহনের উপযোগী হেলিকপ্টার তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে চীনের। বর্তমানে ভার বহনের সক্ষমতায় এমআই-২৬ বিশ্বে অন্যতম শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
সব মিলিয়ে আক্রমণ, পরিবহন, নৌ-অভিযান ও বিশেষ সামরিক কার্যক্রমের জন্য পৃথক হেলিকপ্টার তৈরি করে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াচ্ছে চীন। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা অর্জনের এই প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে দেশটির সামরিক শক্তি ও আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থানে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
দিয়া হোসাইন/মি.
শর্ত সমূহ:
অশালিন শব্দ/বাক্য ব্যবহার করা যাবে না। কাউকে কটাক্ষ করা যাবে না। কারো প্রতি আক্রমনাত্বক বক্তব্য পেশ করা যাবে না।