বাংলাদেশে দেশজুড়ে বর্তমানে জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং সার্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে সরকার যখন নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই গাজীপুরে সরকারি কোষাগারের বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতির নীলনকশা বাস্তবায়নে মেতে উঠেছে একটি অসাধু চক্র। গাজীপুর সিটি করপোরেশন (জিসিসি) ও জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার কতিপয় অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রভাবশালী দালাল চক্রের যোগসাজশে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে মারাত্মক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গাজীপুরের আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও যানজট নিরসনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘তিন সড়ক হতে যাজোর পর্যন্ত ৬০ ফুট প্রশস্ত সড়ক’ নির্মাণের প্রস্তাব চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু এই সড়ক নির্মাণ ও অধিগ্রহণ কার্যক্রমকে ঘিরে শুরুতেই তৈরি করা হচ্ছে নানা জটিলতা। ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল ও অনৈতিক সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে সরকারি পদে আসীন থেকেই একটি চক্র প্রকল্পের সীমানা নির্ধারণ, জমির প্রাক্কলন (ইস্টিমেট) এবং ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়ায় ভুয়া ও অসত্য তথ্য অন্তর্ভুক্তির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সরকারের খাস জমি, অর্পিত সম্পত্তি কিংবা ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির শ্রেণিকরণ বদলে দিয়ে কোটি কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব তছরুপের ছক আঁকা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইতিমধ্যে একাধিক পত্র-পত্রিকায় নিউজ হওয়ার পরও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।
এসব অনিয়মের প্রধান কারিগর হিসেবে অভিযোগের তির উঠেছে এলএ শাখার সার্ভেয়ার জাহাঙ্গীর আলম ও সোহেল মিয়াজীর দিকে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী এবং তদারকি কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে পুরো কার্যক্রমটি জিম্মি হয়ে পড়েছে। মাঠপর্যায়ে এ চক্রের স্বার্থ বাস্তবায়নে সরাসরি কলকাঠি নাড়ছে ‘মঞ্জু’ ও ‘নয়ন’ নামের দুই প্রভাবশালী দালাল। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ—সার্ভেয়ার জাহাঙ্গীর, সোহেল মিয়াজী এবং সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের সঙ্গে দালাল মঞ্জু ও নয়নের মধ্যস্থতায় লেনদেন না হলে কোনো ফাইল গতি পায় না; আবার তাদের অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি হলেই আইনি নীতিমালা উপেক্ষা করে বানিয়ে নেয়া হচ্ছে অতিরিক্ত মূল্য বা ভুয়া ক্ষতিপূরণের কাগজপত্র।
গাজীপুরের সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, প্রস্তাবিত ৬০ ফুট প্রশস্ত ‘তিন সড়ক-যাজোর’ সড়কটি অত্র অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক ও যোগাযোগের চিত্রে বড় পরিবর্তন আনবে। কিন্তু শুরুতেই যেভাবে অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন বাজেটের সিংহভাগ অবৈধভাবে পকেটে নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে, তাতে চূড়ান্ত বাস্তবায়নের সময় নির্ধারিত বাজেটের চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ সরকারি কোষাগার থেকে খরচ হতে পারে। এতে অবকাঠামো নির্মাণকাজ বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি সরকার চরম রাজস্ব ক্ষতির মুখে পড়বে।
স্থানীয় সচেতন বাসিন্দাদের মতে, “সরকার যেখানে প্রতিটি ক্ষেত্রে অপচয় রোধ ও রাজস্ব বাড়াতে কঠোর নির্দেশ দিয়েছে, সেখানে গাজীপুরে সরকারি চেয়ারে বসে কতিপয় কর্মকর্তা নিজেদের পকেট ভারী করতে ব্যস্ত। তিন সড়ক থেকে যাজোর সড়কের অধিগ্রহণ ও সার্ভে কার্যক্রমের নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে এটি এলাকার উন্নয়নকে চরম বাধাগ্রস্ত করবে।”
এ অবস্থায় প্রস্তাবিত ‘তিন সড়ক হতে যাজোর’ ৬০ ফুট সড়ক নির্মাণে স্বচ্ছতা ফেরাতে এবং সরকারি রাজস্ব রক্ষা করতে অনতিবিলম্বে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত শুরুর আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্থানীয় সরকার বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ এবং দালাল চক্রসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।
গাজীপুর প্রতিনিধি
শর্ত সমূহ:
অশালিন শব্দ/বাক্য ব্যবহার করা যাবে না। কাউকে কটাক্ষ করা যাবে না। কারো প্রতি আক্রমনাত্বক বক্তব্য পেশ করা যাবে না।